কাশ্মীর কিসের জন্য বিখ্যাত—এই প্রশ্নের উত্তর একটি শব্দে দেওয়া যায় না। হিমালয়ের কোলে জড়ানো এই উপত্যকা যেন প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর হস্তশিল্পের এক অপূর্ব মিলনমেলা। ডাল লেকের শান্ত জল, গুলমার্গের তুষারঢাকা ঢাল, শ্রীনগরের মুঘল বাগান—প্রতিটি দৃশ্য যেন কোনো চিত্রশিল্পীর ক্যানভাস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক এখানে আসেন শুধু সৌন্দর্য দেখতে নয়, একটি জীবন্ত ঐতিহ্য অনুভব করতে।
প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি
কাশ্মীরের প্রথম পরিচয় তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। শীতকালে গুলমার্গ বিশ্বের অন্যতম সেরা স্কি রিসর্টে পরিণত হয়। তুষারের পুরু চাদরে ঢাকা পাহাড়ি ঢালে স্কি করার রোমাঞ্চ আলাদা। গ্রীষ্মে সোনমার্গের সোনালি ঘাসের মাঠ আর থাজওয়াস গ্লেসিয়ারের নীল বরফ মন কাড়ে। পাহাড়গামের লিডার নদীর ধারে বসে শোনা যায় পানির কলকল শব্দ, যেন প্রকৃতি নিজেই গান গায়।
বেতাব ভ্যালি, আরু ভ্যালি, ইউসমার্গ—প্রতিটি স্থানের নিজস্ব রূপ আছে। হাউসবোটে রাত কাটানো, শিকারায় চড়ে ডাল লেকের ভাসমান বাজার দেখা—এসব অভিজ্ঞতা জীবনে একবার হলেও করা উচিত। কাশ্মীরের ফুলের বাগান, আপেলের বাগান, কেসরের ক্ষেত—সব মিলে এক রঙিন ছবি।
মুঘল ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী
ইতিহাসের পাতায় কাশ্মীর মুঘল সম্রাটদের প্রিয় গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিখ্যাত উক্তি—“যদি পৃথিবীতে স্বর্গ থাকে, তা এখানে, এখানে, এখানে”—আজও পর্যটকদের মুখে মুখে ফেরে। শালিমার বাগ, নিশাত বাগ, চশমে শাহী—এই তিন মুঘল উদ্যান প্রেম আর স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
শালিমার বাগ নির্মাণ করেছিলেন জাহাঙ্গীর তার স্ত্রী নূরজাহানের জন্য। চারটি টেরাস, ঝর্ণার সারি, ফোয়ারা—সব মিলে এক রাজকীয় পরিবেশ। নিশাত বাগের বারোটি টেরাস প্রতীকীভাবে রাশিচক্রের বারোটি রাশি। চশমে শাহীর প্রাকৃতিক ঝরনা থেকে পানি এসে বাগানকে শীতল রাখে। এই বাগানগুলো শুধু দেখার জায়গা নয়, মুঘল জীবনধারার জানালা।
হস্তশিল্পের বিশ্বরূপ
কাশ্মীর কিসের জন্য বিখ্যাত—এর একটি বড় অংশ তার হস্তশিল্প। পশমিনা শালের নরমতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। চাঙ্গা হ্রদের ছাগলের পশম থেকে তৈরি এই শাল এতটাই হালকা যে একটি আংটির ভিতর দিয়ে যায়। কাশ্মীরি কার্পেটের হাতে বোনা নকশা শতাব্দী প্রাচীন। প্রতিটি গিঁটে শিল্পীর ধৈর্য আর দক্ষতা লুকানো।
পেপিয়ার মাশে শিল্পকর্ম আরেক বিস্ময়। কাগজের পাল্প থেকে তৈরি বাক্স, ফুলদানি, ফ্রেমে হাতে আঁকা সোনালি নকশা। কাঠের খোদাই, তামার পাত্র, নামদা রাগ—প্রতিটি জিনিসে কাশ্মীরি কারিগরদের শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। স্থানীয় বাজারে গেলে দেখবেন, কারিগররা এখনো হাতে বুনছেন, খোদাই করছেন। এই শিল্প কিনলে শুধু স্মৃতি নয়, একটি জীবন্ত ইতিহাস ঘরে নিয়ে যান।
স্বাদের রাজ্য ওয়াজওয়ান
কাশ্মীরের রান্না ছাড়া তার পরিচয় অসম্পূর্ণ। ওয়াজওয়ান—একটি ঐতিহ্যবাহী ভোজ যেখানে ৩৬টি পর্যন্ত পদ পরিবেশন হয়। রোগান জোশের লাল রঙ, গুশতাবার মাংসের গোলা, যখনি মাটনের হালকা টক—প্রতিটি পদে মশলার সুগন্ধ। তাবাক মাজের ক্রিস্পি রিবস, কাবাবের ধোঁয়া ওঠা স্বাদ—মুখে লাগলেই মনে হয় এটাই স্বর্গীয় আহার।
মিষ্টিতে ফিরনি, শুফতা, কাশ্মীরি হালুয়া। কাহওয়া—সবুজ চা, কেসর, দারচিনি, বাদাম মিশিয়ে তৈরি এই পানীয় শীতের সকালে উষ্ণতা দেয়। রাস্তার ধারে কেবাবের দোকান, হাউসবোটের রান্নাঘর—সর্বত্রই খাবারের সুগন্ধ।
অ্যাডভেঞ্চারের স্বর্গরাজ্য
শুধু শান্তি নয়, কাশ্মীর অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদেরও ডাকে। গুলমার্গে স্কি, সোনমার্গে ট্রেকিং, পাহাড়গামে রিভার রাফটিং। আমারনাথ যাত্রা বিশ্বাসীদের তীর্থ। গন্ডোলা রাইডে গুলমার্গের চূড়া থেকে দেখা যায় পুরো উপত্যকা। প্যারাগ্লাইডিং, হর্স রাইডিং, ক্যাম্পিং—প্রতিটি অ্যাকটিভিটি আলাদা রোমাঞ্চ দেয়।
কাশ্মীর কিসের জন্য বিখ্যাত: উপসংহার
কাশ্মীর কিসের জন্য বিখ্যাত—এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার প্রতিটি কোণে। প্রকৃতির সৌন্দর্য, মুঘল ঐতিহ্য, হস্তশিল্পের শিল্প, ওয়াজওয়ানের স্বাদ, অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চ—সব মিলে এই উপত্যকা এক জীবন্ত স্বপ্ন। এখানে আসতে হয় পাহাড়ি পথে হাঁটতে, শিকারায় ভাসতে, কাহওয়া চুমুক দিতে। তবেই বোঝা যায় কেন একে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ বলা হয়।