Videos মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা ২০২৬: নতুন নিয়ম, আবেদন পদ্ধতি - স্কটিশ মৈত্রী

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা ২০২৬: নতুন নিয়ম, আবেদন পদ্ধতি

বিদেশের মাটিতে কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেন না এমন মানুষ খুব কমই আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কাছে মালয়েশিয়া সবসময়ই একটি পছন্দের গন্তব্য। দেশটির মনোরম পরিবেশ, কাজের সুযোগ এবং আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো শ্রমিকদের আকৃষ্ট করে। আপনি যদি বর্তমানে মালয়েশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে আপনাকে অবশ্যই মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। কলিং ভিসা হলো মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট বিদেশি কর্মীকে সে দেশে কাজ করার জন্য দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়া সরকার তাদের শ্রমবাজার এবং অভিবাসন নীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে, যা প্রতিটি আবেদনকারীর জানা অত্যন্ত জরুরি।

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, মালয়েশিয়ার কোনো নিয়োগকর্তা বা কোম্পানি যখন তাদের কাজের জন্য বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করতে চায়, তখন তারা সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা KDN (Kementerian Dalam Negeri) এর কাছে আবেদন করে। সরকার যখন সেই আবেদন মঞ্জুর করে কর্মী নেওয়ার অনুমতি দেয়, তখন সেই অনুমতিপত্র বা ইনভিটেশন লেটারকেই আমরা সাধারণ ভাষায় কলিং ভিসা বলে থাকি। এই ভিসার মাধ্যমেই একজন কর্মী বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে পারেন এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেন।

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা ২০২৬ এর বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০২৬ সালে মালয়েশিয়া সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার সংস্কারের লক্ষ্যে নতুন কিছু নীতিমালা কার্যকর করেছে। বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো যায়। বিশেষ করে ‘Foreign Workers Centralized Management System’ বা FWCMS সিস্টেমের মাধ্যমে এখন পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এর ফলে একজন কর্মী সহজেই তার আবেদনের অবস্থান বা স্ট্যাটাস অনলাইনের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেন।

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

একটি সফল আবেদনের জন্য সঠিক কাগজপত্র থাকা অপরিহার্য। কাগজপত্রে সামান্য ভুল থাকলে আপনার ভিসা আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। নিচে মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের তালিকা দেওয়া হলো:

১. বৈধ পাসপোর্ট: পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ১ বছর বা ১২ মাস থাকতে হবে। পাসপোর্টের কোনো পাতা ছেঁড়া বা তথ্য অস্পষ্ট হওয়া চলবে না।

২. ছবি: ল্যাব প্রিন্ট করা পাসপোর্ট সাইজের ছবি যার ব্যাকগ্রাউন্ড অবশ্যই সাদা হতে হবে। কোনো চশমা বা টুপি পরা ছবি গ্রহণযোগ্য নয়।

৩. মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট: মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে।

৪. পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট: আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই—এটি নিশ্চিত করতে স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে।

৫. পেশাগত অভিজ্ঞতার সনদ (যদি থাকে): আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট কারিগরি কাজে দক্ষ হন, তবে তার সনদ যুক্ত করলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

কলিং ভিসা পাওয়ার ধাপসমূহ (Step-by-Step Process)

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং এটি কয়েক ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি আলোচনা করা হলো:

১. ডিমান্ড লেটার এবং কোটা অনুমোদন

প্রথমে মালয়েশিয়ার কোনো কোম্পানি তাদের কতজন কর্মী লাগবে তার একটি ডিমান্ড লেটার তৈরি করে সে দেশের শ্রম মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে সেই কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের কোটা বা অনুমতি দেয়।

২. বায়োমেডিক্যাল এবং নিবন্ধন

বাংলাদেশে থাকা একজন ইচ্ছুক কর্মীকে প্রথমে সরকার নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টারে গিয়ে বায়োমেডিক্যাল সম্পন্ন করতে হয়। এই ধাপে চোখের স্ক্যান এবং আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। এটি সম্পন্ন হলে আপনার তথ্য মালয়েশিয়ার FWCMS সিস্টেমে যুক্ত হয়ে যায়।

৩. কলিং লেটার ইস্যু

মেডিকেল রিপোর্ট ‘ফিট’ আসলে এবং আপনার যাবতীয় তথ্য সঠিক থাকলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা আপনার নামে একটি ইনভিটেশন বা কলিং লেটার ইস্যু করবে। এটি সাধারণত একটি পিডিএফ ফাইল হিসেবে আসে যাতে আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর এবং কোম্পানির নাম উল্লেখ থাকে।

৪. ভিসা ডি রেফারেন্স (VDR) সংগ্রহ

কলিং লেটার পাওয়ার পর ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান হাইকমিশনে VDR বা ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। এটি মূলত একটি সাময়িক অনুমোদন যা আপনাকে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেয়।

৫. ম্যানপাওয়ার বা স্মার্ট কার্ড (BMET)

মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) থেকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়। এটিই আমাদের দেশে স্মার্ট কার্ড হিসেবে পরিচিত। এটি ছাড়া বিমান বন্দরে আপনাকে আটকে দেওয়া হতে পারে।

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা খরচ ২০২৬

ভিসা খরচ নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারিভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ অনেক কম হলেও বিভিন্ন এজেন্সি বা দালাল চক্রের কারণে এই খরচ অনেক সময় আকাশচুম্বী হয়ে যায়। নিচে একটি সম্ভাব্য ব্যয়ের তালিকা দেওয়া হলো:

ব্যয়ের খাতসম্ভাব্য খরচ (টাকা)
পাসপোর্ট তৈরি (জরুরি/সাধারণ)৫,০০০ – ৮,০০০ টাকা
বায়োমেডিক্যাল ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা৮,৫০০ – ১০,০০০ টাকা
সরকারি লেভি ও ইন্স্যুরেন্স ফিমালয়েশিয়ান রিংগিত অনুযায়ী
স্মার্ট কার্ড ও কল্যাণ তহবিল ফি৪,০০০ – ৫,০০০ টাকা
বিমান টিকিট (একমুখী)৩৫,০০০ – ৫০,০০০ টাকা
এজেন্সি সার্ভিস চার্জআলোচনার ভিত্তিতে

বিশেষ দ্রষ্টব্য: মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট খাতে জিরো কস্ট বা বিনা খরচে কর্মী নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ফোমেমা (FOMEMA)

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে। যদি আপনার শরীরে হেপাটাইটিস বি, সিফিলিস, যক্ষ্মা বা এইচআইভির মতো রোগ থাকে, তবে আপনি মালয়েশিয়ায় কাজের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর সেখানেও আপনাকে পুনরায় ‘FOMEMA’ এর অধীনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিতে হবে। সেখানে আনফিট হলে আপনাকে নিজ খরচে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। তাই দেশ থেকে যাওয়ার আগেই নিশ্চিত হয়ে নিন আপনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ।

কলিং ভিসা চেক করার নিয়ম

বর্তমান ডিজিটাল যুগে আপনি ঘরে বসেই আপনার ভিসার বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে পারেন। মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা FWCMS পোর্টালে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট নম্বর প্রদান করে স্ট্যাটাস চেক করা যায়। যদি স্ট্যাটাসে ‘New’, ‘Approved’ বা ‘Calling Issued’ লেখা থাকে, তবে বুঝবেন আপনার ভিসা প্রসেসিং সঠিক পথেই আছে।

দালালের হাত থেকে বাঁচার উপায়

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা দেওয়ার নামে অনেক সময় ভুয়া এজেন্টরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারণা এড়াতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নম্বর যাচাই করুন।
  • কোনো লেনদেন করার আগে স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করুন।
  • অনলাইনে আপনার পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ভিসা চেক না করে টাকা দেবেন না।
  • জনশক্তি অফিস বা BMET থেকে এজেন্সির বৈধতা নিশ্চিত করুন।

মালয়েশিয়ায় কাজের পরিবেশ ও বেতন

২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় নতুন ন্যূনতম মজুরি বা মিনিমাম ওয়েজ কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে একজন সাধারণ কর্মী মাসে গড়ে ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ রিংগিত মূল বেতন পেতে পারেন। ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কাজ করলে এই আয় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ রিংগিত পর্যন্ত হতে পারে। তবে থাকা এবং খাওয়ার খরচ কোম্পানি বহন করবে কি না, তা ভিসার চুক্তিতে আগেই দেখে নেওয়া উচিত। সাধারণত কনস্ট্রাকশন, প্ল্যান্টেশন (বাগান), ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সার্ভিস সেক্টরে প্রচুর কর্মীর চাহিদা রয়েছে।

প্রশ্ন-উত্তর সেকশন (FAQs)

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা পেতে কতদিন সময় লাগে?

সাধারণত সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ২ থেকে ৪ মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। তবে কোটা এবং এজেন্সির দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সময় কম-বেশি হতে পারে।

আমি কি সরাসরি কোম্পানি থেকে কলিং ভিসা পেতে পারি?

হ্যাঁ, যদি আপনার পরিচিত কেউ মালয়েশিয়ায় থাকে এবং তার কোম্পানি আপনাকে নিতে চায়, তবে সরাসরি কলিং আনা সম্ভব। তবে সরকারি ক্লিয়ারেন্সের জন্য আপনাকে কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সাহায্য নিতেই হবে।

মেডিকেল আনফিট হলে কি টাকা ফেরত পাওয়া যায়?

বায়োমেডিক্যাল বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি সাধারণত অফেরতযোগ্য। তবে এজেন্সিকে দেওয়া অগ্রিম টাকা আপনি চুক্তিনুযায়ী ফেরত পেতে পারেন।

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা কি রিনিউ বা নবায়ন করা যায়?

হ্যাঁ, প্রতি বছর শেষে আপনার মালিক আপনার কাজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পারেন। সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত একজন কর্মী সেখানে থাকতে পারেন।

স্মার্ট কার্ড ছাড়া কি মালয়েশিয়া যাওয়া সম্ভব?

না, বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী বিদেশের মাটিতে কাজ করতে যাওয়ার জন্য BMET স্মার্ট কার্ড বাধ্যতামূলক।

শেষ কথা

মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, যদি আপনি সঠিক পথে এবং বৈধভাবে যেতে পারেন। লোভে পড়ে বা তাড়াহুড়ো করে অবৈধ কোনো পথ বেছে নেবেন না। ২০২৬ সালের নতুন নিয়মগুলো মেনে আবেদন করলে আপনি সফলভাবে মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে পারবেন। মনে রাখবেন, বিদেশের মাটিতে আপনার পরিচয় কেবল আপনার কাজ নয়, আপনার সততাও। দালালদের খপ্পর থেকে বাঁচতে সর্বদা সচেতন থাকুন এবং সঠিক তথ্য যাচাই করে পদক্ষেপ নিন। আপনার নিরাপদ প্রবাস যাত্রা কাম্য।