গ্রীনল্যান্ড: যে দেশে মধ্যরাত্রিতেও সূর্যাস্ত হয় না

গ্রীনল্যান্ডে দেখা যায় মিডনাইট সান যা এই দেশটির অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখানে বসবাস করে এস্কিমো নামের আদিবাসী সম্প্রদায়। ডেনমার্কের অধীনে থাকা দেশটি নিয়ে লিখেছেন দুই বাংলার অন্যতম সেরা ভ্রমণ লেখক লিয়াকত হোসেন খোকন

গ্রীনল্যান্ড উত্তর আমেরিকার একটি দেশ। দেশটি আটলান্টিক মহাসাগর ও এন্টার্কটিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। একসময় গ্রীনল্যান্ড ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিল।

গ্রিনল্যান্ড এর আয়তন কত?

গ্রীনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। এর আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩০ বর্গমাইল। এ দেশে জনসংখ্যা মাত্র ৫৬ হাজার ১৮৬ জন।

বিশাল এই দ্বীপের কোণায় কোণায় ভিড় জমিয়ে আছে হাতে গোনা অল্প কিছু লোকজন।

গ্রীনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর নুক। এটিই গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী। আর এখানে জনসংখ্যা মাত্র ১৭ হাজার।

দ্বীপটির অধিকাংশই সুমেরীয় বৃত্তের উত্তর অংশে অবস্থিত। এটি পশ্চিম দিকে ডেভিস প্রণালী ও ব্যাফিন উপসাগর দ্বারা প্রাথমিকভাবে কানাডীয় সুমেরীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আর এই দ্বীপের পূর্ব দিকে ডেনমার্ক প্রণালী দ্বারা আইসল্যান্ড থেকে পৃথক হয়েছে।

গ্রীনল্যান্ডের দাপ্তরিক ভাষা গ্রিনল্যান্ডীয় ডেনীয়।

গ্রীনল্যান্ডের সর্ব উত্তরের বিন্দু মরিস জেসাস অন্তরীপ থেকে সর্ব দক্ষিণের বিন্দু ফেয়ারওয়েল অন্তরীপের দূরত্ব ২,৬৬০ কিলোমিটার। দেশটি মেরু অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে সূর্যের দেখা পাওয়া যায় মাত্র ৩ ঘন্টা বা তার একটু বেশি কিম্বা কমও হয়ে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন এক পরিবেশ যেন কালো চাদরের মতো ঝুলে থাকে গোটা গ্রীনল্যান্ড দ্বীপজুড়ে। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে এটা সাইবেরিয়া নয়, এই ঠান্ডা অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপেও লুকিয়ে রয়েছে বিচিত্র সব সৌন্দর্য।

সারা বছর বরফে ঢেকে থাকলেও গ্রীষ্মকালে এই দ্বীপের রূপ আরেক রকমের হয়। অর্থাৎ তখন সূর্য ডুবতে দেখা যায় না। আসলেই গ্রিনল্যান্ড এক অদ্ভুত দেশ। গ্রীষ্মের সময়ে এ দেশে ২৪ ঘন্টা সূর্য আলোকিত হয়ে থাকে। তখন দিন -রাত  একই রকম রূপ নেয়। সূর্য উদয় হয়ে থাকে, কিন্তু অস্ত নামে না।

গ্রীনল্যান্ডের বেশির ভাগ শহর দ্বীপের পশ্চিম উপকূলবর্তী এলাকায়। সেই এলাকায় বেশ কয়েকটি পার্ক রয়েছে।

গ্রীনল্যান্ড

গ্রীনল্যান্ডে ইনুইটর জাতি সর্বপ্রথম প্রবেশ করে, সেটা ছিল ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে। অর্থাৎ গ্রীনল্যান্ডের ইতিহাস বেশ পুরনো – ইউরোপীয়রা এখানে আসার পরে স্থাপত্য গড়ে ওঠে। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গড়ে তুলেছিল ইনুইটররা।

কখনো এই দ্বীপের পশ্চিম উপকূলবর্তী এলাকায় নরওয়েজিয়ান ও আইসল্যান্ড বাসিন্দারা বসবাস করেছিল।

গ্রিনল্যান্ডের নামকরণ করেছিলেন এরিক দ্যা রেড। তিনি আইসল্যান্ড থেকে খুনের অপরাধে বিতাড়িত হয়ে গ্রীনল্যান্ডে নির্বাসিত হন। তবে জানা যায়, এরিক দ্যা রেড মার্কেটিং পার্স্পেক্টিভ থেকে এর নাম রাখেন যাতে এই নাম শুনে মানুষ গ্রীনল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী হয়।

বরফের দ্বীপ গ্রীনল্যান্ডে যাতায়াত ব্যবস্থা সুবিধাজনক নয়। অন্য দেশ থেকে গ্রীনল্যান্ড সরাসরি যাতায়াতের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। গ্রীনল্যান্ডের অভ্যন্তরে রয়েছে ১৬টি বড় শহর। কিন্তু একটি শহর থেকে আরেকটি শহরে যাতায়াত করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। অধিকাংশ লোক এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াত করে উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টারে। কেউবা নিজেদের তৈরি যানবাহন নিয়ে চলাচল করে থাকে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – স্লেজ, কায়াক এবং স্নো স্যু।

স্কটল্যান্ড থেকে জাহাজে গ্রীনল্যান্ড যাওয়া যায়। গ্রীনল্যান্ডে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সূর্যের আলো দিবারাত্র পাওয়া যায়। অক্টোবর মাস থেকে ঝড়, বরফ ও শীতের সূত্রপাত থাকে। শীত যে কত কঠিন হতে পারে গ্রীনল্যান্ডে যিনি যাবেন তিনি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারবেন। মাইনাস ৫০ ডিগ্রি শীত পড়ে এখানে। এতোটা শীত যে কত কষ্টকর তা ওখানকার লোকজন বুঝতে পারেন। তবে শীত তাদের সয়ে গেছে।

গ্রীনল্যান্ডে সবুজের অভাব, গ্রীন কোথাও দেখা যাবে না। চারিদিকে চিরতুষারে ঢাকা একেবারে সাদা। এখানকার লোকেদের স্বাস্থ্য ভালো। গায়ের রং ফর্সা, অনেকাংশে যেন ভুটিয়াদের সঙ্গে মিল দেখা যায়। এরা চামড়ার পোশাক পরে।

গ্রীনল্যান্ডে থাকে এস্কিমোরা। এরা সবচেয়ে ভালোবাসে স্প্যানীশ মদ খেতে। তাই এই দুই দেশের মধ্যে তার আদান প্রদান আছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ডেনমার্কের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। এখানকার লোকজন অনেকে ডেনিশ ভাষা অল্পবিস্তর জানে।

এখানের লোকেদের পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। গ্রীনল্যান্ডের এস্কিমোদের ওপর শোষণ হতে পারে, এ জন্য ডেনমার্ক নিয়ম জারি করেছিল যে, বিশেষ ইঞ্জিনিয়ার বা অভিযাত্রী ছাড়পত্র নিয়েই তবে গ্রীনল্যান্ডে ঢুকতে পারবে। পাদ্রীরা ধর্ম প্রচারের নামে অপকর্ম করবার সুবিধা যাতে না পায় সে জন্য তাদের প্রবেশ নিষেধ ছিল বহু বছর ধরে।

এখানকার লোকজন খুব মিশুক। প্রথম দেখায় অপরের সঙ্গে করমর্দন করতে পছন্দ করে। এরা মদ, ময়দা, আলু, পিঁয়াজ গুদামজাত করে থাকে। এসব দ্রব্য কেউ নিয়ে গেলে তারা এর পরিবর্তে মাছ, মাছের তেল, চামড়া ইত্যাদি দেয়। লেনদেনের জন্য এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডলার -পাউন্ডের প্রয়োজন মনে করে না। মালের পরিবর্তে মাল, বার্টার সিস্টেম যাকে বলে।

ওখানের কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলে তিনি অতিথিকর সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে থাকেন। এরা বরফের ঘরে থাকে, যারা বেড়াতে যান তাদেরকেও বরফের ঘরে থাকতে দেন। এদের বাড়ির কাছেই থাকে গুদাম। আর প্রকাণ্ড বরফের বাড়ি মানে একটি ঘর। এদের গুদামে থাকে মাছ, সীলের চামড়া ও মাছের তেল, কড লিভার তেল ইত্যাদি।

এস্কিমোদের পূর্বপুরুষেরা বেয়ারিং অন্তরীপের বরফ পার হয়ে আলাস্কার পথে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল।

একদা গ্রীনল্যান্ডের এস্কিমোরা গরমের দিনে নগ্ন হয়ে কড লিভার তেল মাখত, তা দেখে পাদ্রীরা বলতো, তোমরা অসভ্য, কাপড় খুলে তেল মাখো।

অতীতে গ্রীনল্যান্ডে পাদ্রীরা নাকি আরও একটা ক্ষতি করেছিল সে দেশে, যৌন রোগও তারাই ছড়িয়ে দিয়েছিল গ্রীনল্যান্ডে।

সেই গ্রীনল্যান্ড এখন অনেকের কাছে স্বপ্নের দেশ।

scottish moithree

Subscribe to Scottish Moithree for the latest news, community, culture, events and stories from across Scotland.

We don’t spam! Read our privacy policy for more info.

Leave a Comment