আহসান মঞ্জিল কে নির্মাণ করেন, কেন বিখ্যাত?

আহসান মঞ্জিল যা ঢাকা শহরের ১৯ শতকের ঐতিহ্য ও প্রদান রাজনৈতিক কেন্দ্র। নদীমাতৃক এ দেশে ঢাকা শহরের দক্ষিণে (পুরাতন ঢাকা) ইসলামপুরের কুমারটুলীতে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে তৎকালীন নওয়াব আব্দুল গনি ১৮৭২ সালে আহসান মঞ্জিল তৈরি করেন। তিনি এই ভবনের নামকরণ করেন মূলত তার পুএের নাম অনুসারে। তার পুএ খাজা আহসানুল্লহর নামে তিনি আহসান মঞ্জিল নামকরণ করেন।

আহসান মঞ্জিল তৎকালীন সময়ে নবাব পরিবারের বসবাসের বা আবাসিক ভবনের জন্য তৈরি করা হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যায় থেকে তার আগামী ১০০ বছর পর্যন্ত আহসান মঞ্জিলকে (প্রাসাদটিকে) বাংলার একটি প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯০৬ সালে আহসান মঞ্জিলে এক বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং এই আহসান মঞ্জিল থেকে মুসলিম লীগ নামের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আহসান মঞ্জিল নামের প্রাসাদের ভবনটির পরিমাপ ১২৫. ৪ মিটার ও ২৮.৭৫ মিটার। আহসান মঞ্জিল ১ মিটার উঁচু বেদির উপর নির্মাণ করা দ্বিতল প্রাসাদ।

নিচতলার মেঝে থেকে ছাঁদ পর্যন্ত আহসান মঞ্জিলের উচ্চতা ৫ মিটার ও অনুরূপ ভাবে দোতলা থেকে ৫.৮ মিটার। আহসান মঞ্জিলের উত্তর ও দক্ষিণ কোনে (দিকে) প্রায় একতলার সমান উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছিল গাড়ি বারান্দা। যা বর্তমান সময়ে সুস্পষ্ট হিসেবে আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি। দক্ষিণ কোনের (দিকের) নির্মাণ করা গাড়ি বারান্দার উপর থেকে দোতলা বারান্দা থেকে সুবৃহৎ খোলা সিড়ির সম্মূখের বাগান বুড়িগঙ্গা নদীর ধার পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। যার অপরূপ দৃশ্য যেকোন মানুষকে মুগ্ধ করবে। তৎকালীন সময়ে ফোয়ারা ছিল  এই  সিঁড়ির সামনে বাগানে, যা বর্তমানে সময়ে তা দৃশ্যমান নয়। আহসান মঞ্জিলের উভয় তলার উওর ও দক্ষিণ কোনে (দিকে) অর্ধবৃত্তাকার খিলনাসহযোগে বড় বারান্দা রয়েছে। আহসান মঞ্জিলের কক্ষ ও বারান্দার মেঝে মার্বেল পাথরে তৈরি (শোভিত)। এছাড়াও আহসান মঞ্জিল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই পোস্টে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আহসান মঞ্জিল

আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস

১৯ শতকের ঐ সময়ে নতুন নির্মিত প্রাসাদটি বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। আহসান মঞ্জিলের শুরুটা ১৮৭২ সালে হলেও এর মাঝে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ভবন নির্মাণ এর ১৬ বছর পর ১৮৮৮ সালে ৭ এপ্রিল ভূমিকম্পে আহসান মঞ্জিল ব্যাপক ক্ষতি হয়। যার পুনর্গঠন এর জন্য বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় গম্বুজটি নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন সময়ে আহসান মঞ্জিলের মতো কোন ভবন ঢাকা শহরে ছিল না। এরপর ১৮৯৭ সালে ঢাকায় ভূমিকম্প হবার কারনে আহসান মঞ্জিলের আবার ব্যাপক ক্ষতি হয়। তৎকালীন নবাব আহসান মঞ্জিলের পুনঃনির্মান করেন। পরবতর্তীতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদে আহসান মঞ্জিল সরকার অধিগ্রহণ করেন। আহসান মঞ্জিলে মূল্যবান জিনিস পএ থাকার কারনে নবাব পরিবার এসব জিনিস নিলামে ক্রয় করে নেয়।  সর্বশেষ ১৯৯২ সালে আহসান মঞ্জিল বাংলাদেশ জাদুঘর এটি পুনঃসংস্কার করেন এবং আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘর হিসেবে চিহ্নিত করেন। 

 আহসান মঞ্জিল কে নির্মাণ করেন

আহসান মঞ্জিল ১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে তৈরি করা হয়। তৎকালীন নওয়াব আব্দুল  গনি ১৮৭২ সালে আহসান মঞ্জিল তৈরি করেন। আহসান মঞ্জিলের স্থাপত্য প্রকৌশলীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। আহসান মঞ্জিলের 

নির্মাণ কাজ শুরু  ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে। আহসান মঞ্জিলের নির্মাণ কাজ হতে প্রায় ১৩ বছর সময় লাগে। যা ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তৎকালীন সময়ে আহসান মঞ্জিল মূলত নবাব পরিবারের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারীর সদর কাছারির জন্য ছিল। 

আহসান মঞ্জিল কেন বিখ্যাত

আহসান মঞ্জিলকে বাংলাদেশের সেরা ১০ বিখ্যাত জায়গার তালিকা ২য় স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আহসান মঞ্জিল বিখ্যাত তার স্থাপত্য ও তার অবস্থান এর জন্য। প্রতিবছর দেশ বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পর্যটক আহসান মঞ্জিলে ঘুরতে আসে। আহসান মঞ্জিল নির্মান করা হয়েছে পুরাতন ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে, নদীর তীর পর্যন্ত রয়েছে ফুলের উদ্যান তাছাড়া আহসান মঞ্জিলের কক্ষ ও বারান্দার মেঝে মার্বেল পাথরে তৈরি (শোভিত) যা পর্যটকের আরো দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আহসান মঞ্জিলের ২৩টি কক্ষে ৪০৭৭টির বেশি নিদর্শন রয়েছে। বর্তমানে আহসান মঞ্জিলকে জাদুঘর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ও বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৯২ সালে ২৩টি  গ্যালারী নিয়ে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর পুনঃসংস্কার করা হয়।  আহসান মঞ্জিলের ছাদের উপরে রয়েছে সুন্দর একটি গম্বুজ। এক সময়ে এই গম্বুজটি চূড়া ঢাকা শহরের সর্বোচ্চ  চূড়া হিসেবে আক্ষয়িত করা হতো।

আহসান মঞ্জিলের মূল ভবনের বাইরে এি-তোরণবিশিষ্ট প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই প্রবেশদ্বার দেখতে খুব সুন্দর। একইভাবে আহসান মঞ্জিলে উপরে উটার সিঁড়িগুলোর দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন সকল পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আহসান মঞ্জিলের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দুই প্রান্তের রয়েছে দুইটি মনোরম তোরণ যা সবচেয়ে সুন্দর। এছাড়া আহসান মঞ্জিলে র অভ্যন্তরে (ভিতরে) দুইটি অংশ রয়েছে। একটি হলো বৈঠকখানা এবং অপরটি হলো পাঠাগার রয়েছে। পাঠাগারের অবস্থান পূর্ব অংশে। এছাড়া নাচঘর ও অন্যান্য আবাসিক কক্ষ রয়েছে আহসান মঞ্জিলের পশ্চিম অংশে। আহসান মঞ্জিলের নিচতলা অবস্থিত রয়েছে দরবারগৃহ ও ভোজন কক্ষ। ভূমি থেকে আহসান মঞ্জিলের গম্বুজের উচ্চতা ২৭.১৩ মিটার। ধারণা করা হয় আহসান মঞ্জিলের ভবনে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলেছিল। আহসান মঞ্জিল এতোটা সুন্দর যে তৎকালীন সময়ে লর্ড কার্জন ঢাকায় অবস্থান  করলে আহসান মঞ্জিলে অবস্থান করতেন। 

আহসান মন্জিল

আহসান মঞ্জিল এর টিকেট কাটার নিয়ম

আহসান মঞ্জিল যেহেতু জাদুঘর সেহেতু এখানে পরিদর্শন করতে টিকেট কাটতে হয়। আহসান মঞ্জিলে ১২ বছরের অধিক থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত মানুষের পরিদর্শন ফ্রী হিসেবে প্রতিজনের জন্য ৪০+চার্জ  টাকার টিকেট রয়েছে। যারা শিশু বিশেষ করে ১২ বছরের নিচে অপ্রাপ্ত শিশুরা জনপ্রতি ২০+চার্জ টাকা দিয়ে টিকেট ক্রয় করে আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করতে পারেন। তবে উল্লেখ্য যে বিদেশি পর্যটকের জন্য জনপ্রতি টিকেট ৫০০+ চার্জ  টাকা পরিদর্শন ফী। প্রতিবন্ধী শিশুদের আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনে কোন টিকেট খরচ নেই। তবে ছাএ ছাএীরা যদি পূর্বে আবেদন করে থকেন আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন এর তাহলে অনেক সময় ছাএ ছাএীরা বিনামূল্যে পরিদর্শন করতে পারবে। আহসান মঞ্জিলের টিকেট অনলাইনে ক্রয় করার ধাপ সমূহ:-

  • প্রথমে আপনাকে আহসান মঞ্জিলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে যেতে হবে। লিংক: https://www.ahsanmanzilticket.gov.bd/
  • এরপর আপনি Buy Ticket  এ আপনি ক্লি করে রেজিষ্ট্রেশন করে নিবেন। এরপর আপনি লগইন করে টিকেট ক্রয় করতে পারবেন। টিকিট ক্রয় করার সম্য় অবশ্যই আহসান মঞ্জিলে ভ্রমণ করার দিন নিশ্চিত করুন। 
  • আপনি একের অধিক এখান থেকে টিকিট ক্রয় করতে পারবেন। 
  • এরপর আপনি আপনি যেহেতু পেমেন্ট করেননি সেহেতু ওয়েবসাইটে পেমেন্ট করার অপশন পেয়ে যাবেন। এরপর আপনি পেমেন্ট করে পেমেন্ট স্লিপটি প্রিন্ট করে নিবেন পারেন। 
  • আপনি আহসান মঞ্জিলে যখন ভ্রমণের উদ্দেশ্য আহসান মঞ্জিল যাবেন তখন আপনার প্রিন্ট কৃত পেমেন্ট করার কাগজ বা একটি নম্বর আপনার মোবাইল থেকে জানান তারা নিশ্চিত করবেন যে আপনি পেমেন্ট নিশ্চিত করেছেন কিনা। 

আহসান মঞ্জিল সময় সূচি ২০২৩

আহসান মঞ্জিলের সময় সূচি  ২০২৩ সালে প্রতি সপ্তাহে শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০ টা ৩০ মিনিট হতে বিকাল ৫ টা ৩০ পর্যন্ত আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করার সুযোগ থাকে। আবার প্রতি শুক্রবার বিকাল ৩ ঘটিকা থেকে রাত ৮ ঘটিকা পর্যন্ত আহসান মঞ্জিলে পরিদর্শন করা যায়। তবে উল্লেখ্য যে সরকারি ছুটির দিনে ও প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করার সুযোগ নেই।  আহসান মঞ্জিল জাদুঘর এ সময়ে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।


আরও পড়ুন: হোসেনী দালান নির্মাণ করেন কে?

ঢাকার যেসব অনন্য সাধারণ স্থাপত্য কীর্তি ভ্রমণ পিয়াসীদের পদচারণায় মুখরিত

রহস্যে ঘেরা কামরূপ কামাক্ষ্যা

আহসান মঞ্জিল বন্ধ কবে

আহসান মঞ্জিল প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে। এছাড়া সরকারি অন্যান্য ছুটিতে আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করার সুযোগ নেই। 

শেষ কথা

আহসান মঞ্জিল বাঙালিদের ঐতিহ্য। ১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে তৈরি এ ভবনটি সকল পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভবনটির কারুকাজ ও দৃষ্টি নন্দন বৈচিত্র্য ১৯ শতকের অন্যান্য ভবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। আপনি যদি আহসান মঞ্জিলে ভ্রমণ করে না থাকেন তাহলে আপনি আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করে আসতে পারেন ও আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আশা করি এই পোস্টটি থেকে আপনি জানতে পেরেছেন যে আহসান মঞ্জিল সম্পর্কে।

Leave a Comment