-ইশিতা মজুমদার
রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
এডিনবরার আকাশে ঝিরঝিরে বৃষ্টি।
জানালার পাশে বসে চায়ের কাপ হাতে বৃদ্ধ মানুষটি পুরোনো কাঠের বাক্সটি আবার খুললেন। বাক্সের ভেতরে যত্ন করে রাখা আছে কয়েকটি হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি।
প্রতিটি চিঠির নিচে একই নাম—
“মা”
মোবাইল, ভিডিও কল আর মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া বার্তার এই যুগে হাতে লেখা চিঠির গন্ধ যেন হারিয়ে গেছে। কিন্তু আব্দুল করিম সাহেবের কাছে চিঠিগুলোই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
প্রায় বিশ বছর আগে তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে স্কটল্যান্ডে এসেছিলেন। ভেবেছিলেন, কয়েক বছরের মধ্যেই ফিরে যাবেন। কিন্তু সংসার, কাজ, সন্তানদের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে সেই “কয়েক বছর” কেমন করে দুই দশক হয়ে গেল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি।
মা প্রতি মাসেই একটি করে চিঠি লিখতেন।
চিঠিতে বড় কোনো কথা থাকত না।
“খাবার ঠিকমতো খাস।”
“ঠান্ডায় গরম কাপড় পরিস।”
“আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।”
এতটুকুই।
কিন্তু এই কয়েকটি লাইনের মধ্যেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
একদিন হঠাৎ চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর ফোনে খবর এল—মা আর নেই।
সেদিনের পর থেকে নতুন কোনো চিঠি আর আসেনি।
তবুও প্রতি শুক্রবার বিকেলে তিনি অজান্তেই জানালার বাইরে ডাকপিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
মনে হয়, হয়তো আজও একটি চিঠি আসবে।
হয়তো লেখা থাকবে—
“বাবা, নিজের যত্ন নিস।”

হঠাৎ দরজার বেল বেজে উঠল।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট নাতনি।
হাতে একটি খাম।
“দাদু, এটা তোমার জন্য।”
আব্দুল করিম অবাক হয়ে খাম খুললেন।
ভেতরে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি লাইন—
“দাদু,
মা বলেছে তুমি নাকি অনেক দিন ধরে চিঠি পাও না।
তাই আমি তোমাকে একটা চিঠি লিখলাম।
তুমি যেন কখনো একা না থাকো।
তোমার নাতনি।”
চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল।
বাক্সের পুরোনো চিঠিগুলোর পাশে নতুন চিঠিটিও রেখে দিলেন।

তিনি বুঝলেন—
চিঠি কখনো শেষ হয়ে যায় না।
ভালোবাসা শুধু এক হাত থেকে আরেক হাতে পৌঁছে যায়।
আর মানুষ বেঁচে থাকে স্মৃতির ভেতর, শব্দের ভেতর, আর কিছু অমলিন চিঠির ভাঁজে।
—সমাপ্ত—
আরও পড়ুন: শাবিন মাহবুব | কবিতাত্রয়ী